Monday, 14 September 2026JK LIVE
বিজ্ঞাপন

পলাতক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে বিপুল দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের তথ্যপ্রমাণ দুদকের তদন্তে

পলাতক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে বিপুল দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের তথ্যপ্রমাণ দুদকের তদন্তে

তাছমিনা খন্দকার, লন্ডন থেকে:

আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন, নিয়োগ বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ এবং বিদেশে অর্থ পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য ও নথি উন্মোচিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রাথমিক তদন্ত ও মামলার নথিপত্র থেকে সাবেক এই ক্ষমতাধর মন্ত্রীর ও তাঁর পরিবারের ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ঢাকার তেজগাঁও থানার মনিপুরিপাড়ার বাসিন্দা এবং দোহারের শাইনপুকুর গ্রামের পৈতৃক সন্তান আসাদুজ্জামান খান কামাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালীন এক বিশাল প্রভাব বিস্তারকারী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর কনস্টেবল ও সাব-ইন্সপেক্টর নিয়োগে পদপ্রতি ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নগদ ঘুষ আদায় করা হতো। এছাড়া পাসপোর্ট অফিস, ইমিগ্রেশন বিভাগ এবং প্রশাসনিক পদোন্নতি ও বদলি বাণিজ্য থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সদস্যরাও এই অর্থনৈতিক অপরাধের সাম্রাজ্যের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কামালের স্ত্রী লুৎফুল তাহমিনা খান, পুত্র শাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতি এবং কন্যা শাফিয়া তাসনিম খানের নামে গড়ে তোলা হয়েছে বিপুল স্থাবর ও অ স্থাবর সম্পত্তি।

দুদকের দাপ্তরিক অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আসাদুজ্জামান খান কামালের নিজের ৯টি অ্যাকাউন্টসহ তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের নামে মোট ৩৬টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করে ফ্রিজ করা হয়েছে। এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রায় ৪১৬ কোটি ৭১ লাখ টাকার অবৈধ ও অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সিআইডি ও দুদকের যৌথ আবেদনের ভিত্তিতে আদালতের নির্দেশে কামালের পরিবারের প্রায় ১২ কোটি টাকার নগদ অর্থ এবং ১৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকার অবৈধ উৎসের সম্পত্তি ফ্রিজ ও জব্দ করা হয়েছে। কেবল ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকাতেই তাঁর ৩০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, জমি ও ক্যাশ গচ্ছিত রাখার তথ্য মিলেছে।

অভিযোগে প্রকাশ, আসাদুজ্জামান খান কামালের একমাত্র ছেলে শাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে রাজধানীর একাধিক বড় প্রকল্পের কাজ ও নিয়োগ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। বর্তমানে তিনি একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেলহাজতে রয়েছেন। অন্যদিকে, তাঁর মেয়ে শাফিয়া তাসনিম খানও বিভিন্ন বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান ও পদ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বিশাল অঙ্কের অর্থ লেনদেনে জড়িত ছিলেন। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কামালের স্ত্রী ও কন্যা ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত জুয়েলারি শপ থেকে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ অলংকার ক্রয় ও বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন।

আন্তর্জাতিক তদন্তের তথ্যানুযায়ী, কামাল ও তাঁর এপিএস মনির হোসেন হুন্ডির মাধ্যমে দুবাইসহ যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রায় ২০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচার করেছেন। এই অর্থ দিয়ে বিদেশে নামে-বেনামে বিভিন্ন প্রপার্টি ও ব্যবসা সাজানো হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

গত ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক এই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিবারসহ আত্মগোপনে চলে যান। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, বর্তমানে তিনি ভারতের কলকাতার নিউ টাউনের একটি বহুতল আবাসন কমপ্লেক্সে অবস্থান করছেন। কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতায় তাঁর দেশে ফেরত আসা এবং আইনি মুখোমুখি হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।

বর্তমানে দেশি ও আন্তর্জাতিক মহলে দাবি উঠেছে—আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসাদুজ্জামান খান কামাল ও তাঁর পরিবারের দেশে-বিদেশে থাকা সমস্ত অবৈধ সম্পদ অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে ক্রোক ও বাজেয়াপ্ত করা হোক এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক বিচার সুনিশ্চিত করা হোক।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

Facebook WhatsApp X Telegram