ডিপিএইচই চট্টগ্রাম সার্কেল: বদলি বাণিজ্য, ঘুষ ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটে কর্মকর্তা-কর্মচারী জিম্মি
স্টাফ রিপোর্টার:
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা কার্যালয়কে ঘিরে বদলি বাণিজ্য, ঘুষ লেনদেন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, চরম হয়রানি এবং বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই দুর্নীতির সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী এবং একই কার্যালয়ের স্টেনোগ্রাফার মোঃ শহীদুল ইসলাম। অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুইজনের যোগসাজশে চাঁদপুর থেকে কক্সবাজারের টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় এক প্রশাসনিক প্রভাববলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
প্রশাসনিক অচলবস্থা ও বদলি বাণিজ্য
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিপিএইচই চট্টগ্রাম সার্কেলের আওতাধীন বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। প্রতি সপ্তাহেই বদলি, পদায়ন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠছে। স্টেনোগ্রাফার শহীদুল ইসলাম তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরীর নাম ব্যবহার করে সার্কেলাধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মুঠোফোনে সরাসরি যোগাযোগ করতেন। কাঙ্ক্ষিত অর্থের বিনিময়ে সুবিধাজনক স্থানে বদলি করা হতো, অন্যথায় শাস্তিমূলক বদলি ও হয়রানির হুমকি দেওয়া হতো। সরাসরি টাকা লেনদেন না হলে শহীদুল ইসলামের মেয়ের নামে ব্যবহৃত একটি বিকাশ নম্বরে অর্থ পাঠাতে বাধ্য করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
একই পদে ৩৫ বছর ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব
অভিযোগের অন্যতম বড় বিষয় হলো, মোঃ শহীদুল ইসলাম ১৯৮৯ সাল থেকে টানা প্রায় ৩৫-৩৬ বছর ধরে চট্টগ্রাম সার্কেল, কুমিল্লা কার্যালয়ে একই পদে (স্টেনোগ্রাফার) কর্মরত রয়েছেন। সরকারি নীতিমালায় নির্দিষ্ট সময় পরপর বদলির নিয়ম থাকলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে বহাল থেকে কার্যালয়ের ভেতরের সার্বিক প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, স্টেনোগ্রাফার পদে কর্মরত থাকলেও তিনি অফিসের প্রধান সহকারীসহ বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতেন। এছাড়া তিনি সাবেক এলজিআরডি মন্ত্রী তাজুল ইসলাম এবং সাবেক সংসদ সদস্য আ.ক.ম. বাহাউদ্দিন বাহারের ঘনিষ্ঠজন ও আত্মীয় পরিচয়ে প্রভাবশালী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
ঘুষের নির্দিষ্ট হার ও সার্ভিস খাতের অপব্যবহার
অভিযোগপত্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসর ও স্বাভাবিক সেবামূলক সুযোগ-সুবিধাকে কেন্দ্র করে নির্ধারিত হারে ঘুষ আদায়ের তথ্য উঠে এসেছে:
পেনশন সংক্রান্ত কাজ: ফাইল নিষ্পত্তির জন্য কর্মচারীদের কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা।
*জিপিএফ (GPF) চূড়ান্ত উত্তোলন: ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা।
*পিআরএল (PRL) মঞ্জুর: ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। হয়রানিমূলক বদলি রোধ:* অবস্থান ও পদ অনুযায়ী ৬০-৭০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দাবি।
দাবি অনুযায়ী টাকা না দিলে ভুয়া ও কাল্পনিক নথিপত্র তৈরি করে কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সাজানো হতো এবং পরবর্তীতে সাময়িক বরখাস্ত বা দুর্গম অঞ্চলে বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হতো।
*জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ*
একজন স্টেনোগ্রাফারের বৈধ আয়ের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জনের বিবরণ দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা সম্পদসমূহ:
*কুমিল্লা শহর:* শহরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড় এলাকায় একটি নির্মাণাধীন সাততলা বহুতল ভবন।
*নিজ জেলা বরিশাল:* বরিশাল সদর এলাকায় বেশ কিছু মূল্যবান জমি ও দৃষ্টিনন্দন দোতলা বাড়ি।
*রাজধানী ঢাকা:* ঢাকার অভিজাত আফতাবনগর এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।
**ব্যাংক গচ্ছিত অর্থ:* নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ এফডিআর (FDR), সঞ্চয়পত্র ও নগদ অর্থ।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সরকারি চাকরির নির্দিষ্ট বেতনস্কেলের বাইরে এসব সম্পদের বৈধ কোনো উৎস নেই। তারা শহীদুল ও তার পরিবারের সকল ব্যাংক হিসাব এবং সম্পদ অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন।
**লিখিত অভিযোগ ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা**
বিভিন্ন সময়ে একাধিক দপ্তরে সুনির্দিষ্ট প্রমাণাদিসহ লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিযোগকারীরা।
*১৭ নভেম্বর ২০২৪:* নোয়াখালী সদর এলাকার বাসিন্দা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়দানকারী মোঃ আবদুল হান্নান প্রধান প্রকৌশলী ও দুদক বরাবর অভিযোগ জমা দেন।
*৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫:* কুমিল্লা সদরের স্থায়ী বাসিন্দা জিয়া উদ্দিন মোঃ রুবেল দুদক সচিব ও স্থানীয় সরকার বিভাগ বরাবর একই বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে আরেকটি আবেদন করেন।
**সাম্প্রতিক বদলি আদেশের তথ্যচিত্র**
অভিযোগের সত্যতার পক্ষে সম্প্রতি জারি করা একাধিক বদলি আদেশকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন অভিযোগকারীরা। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসেই কার্যালয়টি থেকে একাধিক তড়িঘড়ি বদলির আদেশ জারি করা হয়:
*১৫ আগস্ট ২০২৬:* চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার দুই অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিককে পরস্পর বদলি।
*১৭ আগস্ট ২০২৬:* লক্ষ্মীপুর সদর, বোয়ালখালী ও কর্ণফুলী উপজেলার তিন মেকানিককে যথাক্রমে রায়পুর, কর্ণফুলী ও চাটখিল উপজেলায় স্থানান্তর।
*৩০ আগস্ট ২০২৬:* রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির বেশ কয়েকজন মেকানিককে (মোঃ আহসানুল হক, দয়াল দে, পাপড়ি দাশ গুপ্ত, জুয়েল বিশ্বাস, পংকজ কান্তি নাগ, নাছির উদ্দিন) বিভিন্ন উপজেলার দূরবর্তী স্থানে বদলি করা হয়।
**তদন্তের দাবি ও অভিযুক্তদের নীরবতা**
ভুক্তভোগী কর্মচারী ও স্থানীয় সচেতন মহল একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের যাবতীয় কল রেকর্ড, বিকাশ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের লেনদেন, বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র এবং সম্পদের বিবরণী যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে শহীদুল ইসলাম কীভাবে ৩৫ বছর ধরে একই অফিসে বহাল থাকলেন, তার অনুমোদন সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফিরোজ আলম চৌধুরী এবং স্টেনোগ্রাফার মোঃ শহীদুল ইসলামের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে বারবার চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

