Friday, 25 September 2026JK LIVE
বিজ্ঞাপন

প্রকাশ্যে যৌন উত্তেজনা প্রদর্শন কেন অপধার হবে না?

প্রকাশ্যে যৌন উত্তেজনা প্রদর্শন কেন অপধার হবে না?

শাহীন মির্জা:
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সহজলভ্যতা,অবাধ স্বাধীনতা ও প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহারে আজকের ডিজিটাল যুগে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও বর্তমানে এর একটি বড় অংশ জুড়ে চলছে অপব্যবহার। বিশেষ করে কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা প্রভাবী নিজেদের পরিচিতি বাড়াতে ভিউ ও অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে যৌন উত্তেজনা মূলক খোলামেলা পোশাকে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে ভিডিও তৈরি করছেন। এই ধরনের বিষয়বস্তু জনসমক্ষে একধরনের যৌন উত্তেজনার আবেদন সৃষ্টির অপচেষ্টা মাত্র। আর এর মাধ্যমে সমাজে একশ্রেণির মানুষের স্বাধীনতা হরণের পাশাপাশি সামগ্রিক নৈতিক কাঠামো হুমকির মুখে পড়ছে।

প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ও যৌন উদ্দীপক কনটেন্ট প্রচার করার এই প্রবণতা কেবল ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এর ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি সমাজের বাস্তব জীবনে পড়ছে। যখন ডিজিটাল মাধ্যমে এ ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক বা ট্রেন্ড হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন তা তরুণ প্রজন্মকে ভুল পথে পরিচালিত করে। বাকস্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে এই ধরনের অনৈতিক চর্চা আমাদের সভ্য সমাজের নিজেদের ও অন্যের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার এবং শালীন পরিবেশে চলাফেরার স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। তাই প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, প্রকাশ্যে সমাজে যৌন উত্তেজনা ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কারণে কেন এই অপরাধীদের আইনের আওতায় কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হবে না?

আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রতিটি সমাজকে সংযত ও পবিত্র রাখার তাগিদ দেয়। ইসলামসহ সকল প্রধান ধর্মই শালীনতা, পর্দা এবং নৈতিক পবিত্রতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। ইসলাম ধর্মে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এমন যেকোনো কাজ বা প্ররোচনা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে যা সমাজে অনৈতিকতা ও অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়। যখন সামাজিক মাধ্যমে খোলামেলা উপস্থাপনার মাধ্যমে জনসমক্ষে উত্তেজনা ছড়ানো হয়, তখন তা ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিকতার ভিত্তিকে সরাসরি আঘাত করে। ধর্মীয় অনুশাসন ভঙ্গের এই সংস্কৃতি মানুষের ভেতর থেকে খোদাভীতি ও লজ্জাশীলতা দূর করে দিচ্ছে, যা একটি সুস্থ ও আত্মিক সমাজ গঠনের পরিপন্থী।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ কনটেন্টের বহুল প্রচার আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলাকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিচ্ছে। সমাজে পরকীয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে এই অবাধ ও অশ্লীল ভার্চুয়াল প্ররোচনা একটি বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বস্ততা এবং পারিবারিক পবিত্রতা আজ এই ডিজিটাল আগ্রাসনের কারণে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে। পাশাপাশি, কোমলমতি শিশুদের মনে এর নেতিবাচক ও বিকৃত প্রভাব পড়ছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, শৈশব ও কৈশোরে এই ধরনের অনৈতিক দৃশ্যাবলীর সঙ্গে পরিচিতি তাদের মানসিক বিকাশকে কলুষিত করে তুলছে, যা পরবর্তীতে জঘন্য অপরাধপ্রবণতা বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে। দেশে আশঙ্কা জনক হারে শিশু ধর্ষণ অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি ও ঘর ভাঙ্গার মত জঘন্য অপরাধগুলোর পিছনে এই ভার্চুয়াল টিক ট ক অশ্লীল কনটেন্ট নির্মাতাদের নোংরা যৌন উত্তেজনা মূলক ভিডিওগুলো অপরাধ সৃষ্টিতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে ।

রাষ্ট্রীয় ও আইনি কাঠামোর দিক থেকেও এই ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ অপরাধের শামিল। বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কিত ধারাগুলোতে ডিজিটাল মাধ্যমে অশ্লীলতা প্রচার, যৌন সুড়সুড়ি দেওয়া এবং সমাজবিরোধী কনটেন্ট তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে আইনের সঠিক প্রয়োগের দীর্ঘসূত্রিতা এবং নজরদারির অভাবের কারণে অপরাধীরা অনেক সময় পার পেয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করেই তার দায়িত্ব শেষ করতে পারে না; বরং দেশের নাগরিকদের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা করার মূল দায়িত্বও রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়। আইনের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ না থাকায় এই অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

বাকস্বাধীনতা কখনোই লাইসেন্স হতে পারে না অন্যের নৈতিক অধিকার হরণ করার বা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির। স্বাধীনতার একটি সুনির্দিষ্ট সীমা থাকা আবশ্যক, যেখানে অন্যের শালীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোলামেলা অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে লাইভ বা ভিডিও প্রচার করাকে যারা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বলে চালিয়ে দিতে চান, তারা মূলত সমাজের বৃহত্তর ক্ষতি ডেকে আনছেন। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অপব্যবহার যখন সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন তাকে অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে এবং আইনের কঠোর শাসনে তা দমন করা জরুরি।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে অপরাধের আখড়া থেকে মুক্ত করতে এবং সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে এবং অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গণমাধ্যম সর্বত্রই এই ডিজিটাল অবক্ষয়ের কুফল সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে হবে। তরুণ সমাজকে গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে যাতে তারা এই ভার্চুয়াল ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের জীবন ও সমাজকে বিপন্ন না করে।

পরিশেষে বলা যায়, সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ এবং রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলা এই অশ্লীলতা ও যৌন উত্তেজনা সৃষ্টির অপসংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ করা আবশ্যক। ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক অনুভবের প্রতি সম্মান এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে এই অরাজকতা রুখে দিতে। রাষ্ট্র ও সমাজের নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত পদক্ষেপে যদি এখনই এই লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। তাই দেশের স্বার্থে, দশের স্বার্থে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এই অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Share this news as a Photo Card

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

Facebook WhatsApp X Telegram
24 September 2026

প্রকাশ্যে যৌন উত্তেজনা প্রদর্শন কেন অপধার হবে না?

বিস্তারিত কমেন্টস লিংক দেখুন