Thursday, 17 September 2026JK LIVE
বিজ্ঞাপন

অনিয়মে ভরপুর এলজিইডির আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: বহাল তবিয়তে পিডি সাজ্জাদ কবির-জুবায়েদা আক্তার

অনিয়মে ভরপুর এলজিইডির আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: বহাল তবিয়তে পিডি সাজ্জাদ কবির-জুবায়েদা আক্তার

 

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু (সিটিসিআরপি) প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ উঠলেও প্রকল্প পরিচালক সরকার মো. সাজ্জাদ কবিরের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি এখনো প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে বহাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এলজিইডির প্রকল্প-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটেও সাজ্জাদ কবিরকে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফলে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত ও প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র উদ্বেগ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় এবং ২০২৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। এলজিইডির তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। প্রকল্পের উদ্দেশ্য উপকূলীয় শহরগুলোর জলবায়ু ও দুর্যোগ সহনশীলতা বাড়ানো এবং সড়ক, ড্রেনেজ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন। প্রকল্পটি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ধীরগতির অভিযোগ রয়েছে। তবে এলজিইডির সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৩১ মে ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ২৪ শতাংশ এবং ক্রমপুঞ্জিত ব্যয় ৩৩২ কোটি ৯৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা। একই সরকারি তথ্যে প্রকল্পটিকে চলমান এবং ট্র্যাকের মধ্যে রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মাঠপর্যায়ের অগ্রগতি নিয়ে ওঠা অভিযোগ ও সরকারি অগ্রগতি প্রতিবেদনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রকল্প পরিচালক সাজ্জাদ কবির। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তার দায়িত্বকালে প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি প্রভাবশালী বলয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ বলয়ে উপ-প্রকল্প পরিচালক জুবাইদা আক্তার ও উজ্জ্বল ত্রিপুরাসহ কয়েকজন কর্মকর্তার নামও আলোচনায় এসেছে। এলজিইডির প্রকল্প ওয়েবসাইটে জুবাইদা আক্তার ও উজ্জ্বল ত্রিপুরাকে উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দেখানো হয়েছে।

প্রকল্পে জনবল নিয়োগ নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগের সময়ে নিয়োগ পাওয়া আউটসোর্সিং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কনসালট্যান্টদের একটি অংশকে বাদ দিয়ে পরবর্তীতে নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। তবে কার কাছ থেকে কত টাকা নেওয়া হয়েছে বা কোনো নিয়োগে অর্থ লেনদেন হয়েছে কি না, তা নথিপত্র ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই।

ডিজাইন কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন পৌরসভায় অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পূর্বে নিয়োগ দেওয়া ডিজাইনারদের দায়িত্ব বাতিলের পর আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ডিজাইনের কাজ করানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া, অনুমোদন, কাজের মান এবং বিল পরিশোধের বিষয়গুলো যাচাই করার দাবি উঠেছে।

কনসালট্যান্সি প্যাকেজ নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের অভিযোগ। সংশ্লিষ্টদের দাবি, কয়েকটি কনসালট্যান্ট প্যাকেজে বিদেশি টিম লিডারের পদ রাখা হলেও সংশ্লিষ্টদের বাস্তব উপস্থিতি ও কর্মসম্পাদন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশে অবস্থান, প্রকল্পে কাজের সময়, দায়িত্ব পালনের প্রমাণ এবং বিল পরিশোধের নথি পর্যালোচনা করলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব। প্রকল্পে কনসালট্যান্ট নিয়োগের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলজিইডি ২০২৪ সালে প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ অডিট কনসালট্যান্ট নিয়োগের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছিল।

নির্মাণকাজের মান নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রকল্পের আওতায় সড়ক, ড্রেন, মার্কেট ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, কাজের গুণগত মান এবং বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে অসঙ্গতির অভিযোগ থাকায় প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের কাজ সরেজমিন পরিদর্শন ও কারিগরি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। এ প্রকল্পের বিভিন্ন নির্মাণ ও পরামর্শক কাজের দরপত্র ও চুক্তির তথ্য সরকারি ও এডিবির নথিতেও প্রকাশিত রয়েছে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, পিএমসি, ডিটেইলড ডিজাইন কনসালট্যান্ট, ইনস্টিটিউশনাল ক্যাপাসিটি অ্যান্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট এবং অভ্যন্তরীণ অডিট কনসালট্যান্টসহ বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে এসব প্যাকেজে নিয়োগ, কাজের পরিধি, কর্মসম্পাদন, বিল এবং চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে।

অভিযোগের পরও সাজ্জাদ কবিরের স্বপদে বহাল থাকা নিয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলো নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তদন্ত হয়ে থাকলে তার অগ্রগতি কতদূর এবং তদন্ত চলাকালে প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে তদারকি করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়।

অন্যদিকে, সরকারি তথ্য অনুযায়ী সাজ্জাদ কবির ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন। ২০২৬ সালেও তার একাধিক মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনের তথ্য প্রকল্পের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগের মধ্যেও তিনি প্রকল্পের কার্যক্রমে সক্রিয় রয়েছেন।

প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে অভিযোগের বিষয়গুলো যাচাই করতে নিয়োগসংক্রান্ত নথি, কনসালট্যান্সি চুক্তি, উপস্থিতির রেকর্ড, ডিজাইন ও বিল-ভাউচার, নির্মাণকাজের পরিমাপ বই এবং কারিগরি মান যাচাইয়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা জরুরি। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সংশ্লিষ্টদের দায়মুক্তির বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্প হওয়ায় স্বচ্ছতা, আর্থিক জবাবদিহি ও ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

 

Share this news as a Photo Card

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

Facebook WhatsApp X Telegram
16 September 2026

অনিয়মে ভরপুর এলজিইডির আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প: বহাল তবিয়তে পিডি সাজ্জাদ কবির-জুবায়েদা আক্তার

বিস্তারিত কমেন্টস লিংক দেখুন