কাস্টমস কর্মকর্তা মাসুমের অঢেল সম্পদ : ডিবি পরিচয়ে সাংবাদিককে ভয়ভীতি প্রদর্শন
স্টাফ রিপোর্টার:
কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট ঢাকা (উত্তর)-এর রাজস্ব কর্মকর্তা বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন, ফাইল আটকে রেখে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে অনলাইন নিউজ পোর্টাল দুর্নীতির ডায়েরিতে দুই পর্বে সংবাদ প্রকাশের পর এবার পোর্টালটির সম্পাদককে ভয় দেখানোর চেষ্টা করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় নিজেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি সম্পাদকের মোবাইলে ফোন করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দুর্নীতির ডায়েরি সূত্রে জানা যায়, গত ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর অপরিচিত নম্বর থেকে পোর্টালটির সম্পাদকের হোয়াটসঅ্যাপে ফোন আসে। ফোনদাতা নিজেকে ডিবির এডিসি পরিচয় দিয়ে সম্পাদককে অফিসে এসে দেখা করতে বলেন। তবে কী কারণে তাকে দেখা করতে বলা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
সম্পাদক বিষয়টি জানতে চাইলে ফোনদাতাকে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তা লিখিতভাবে জানানোর কথা বলেন। এরপর ফোনদাতা আর কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা লিখিত নোটিশের কথা জানাননি। পরে বিষয়টি নিয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে পুলিশের ও কাস্টমসের একটি সূত্রের মাধ্যমে জানা যায়, ফোনদাতা বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের একজন আত্মীয় বলে দাবি করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে ডিবির কর্মকর্তার পরিচয় ব্যবহার করে ফোন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতির ডায়েরির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে সম্পাদককে চাপের মধ্যে ফেলতে এবং ভয় দেখাতে পুলিশের পরিচয় ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে ফোনদাতার প্রকৃত পরিচয়, ফোন করার উদ্দেশ্য এবং বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের বিরুদ্ধে এর আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বন্ড সুবিধাপ্রাপ্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ফাইল প্রক্রিয়াকরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। প্রশাসনিক অনুমোদন, অডিট কার্যক্রম, শোকজ নোটিশ প্রত্যাহার এবং বন্ড লাইসেন্স নবায়নের ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রেখে অঘোষিত সমঝোতার চাপ তৈরির অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউসের কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে প্রতি মাসে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা অবৈধভাবে আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর ভাটারা মৌজায় বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের স্ত্রী সানজিদা আফরিন লিপির নামে বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৩৭৫৬(IX-I) নম্বর নামজারি মামলার মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের তথ্য উল্লেখ করে এর অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া খতিয়ান নম্বর ২৯৭১৬ ও দাগ নম্বর ২০৭৬৩-এর জমির পরিমাণ নিয়ে নথিগত অসঙ্গতির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মূল নামজারি খতিয়ানে জমির পরিমাণ ০.৪০০০ একর বা ৪০ শতাংশ হলেও ডিজিটাল ভূমি রেকর্ডে একই দাগে ৪.৯৬ একর জমির তথ্য রয়েছে। বিষয়টি যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড ও মালিকানা সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা প্রয়োজন।
উত্থাপিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুম ও তাঁর পরিবারের সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, আয়কর নথি, বন্ড সুবিধাসংক্রান্ত ফাইল নোটিং এবং ডিপ্লোমেটিক ওয়্যারহাউসের লেনদেন তদন্তের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে দুদক ও এনবিআরের কাছে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পাদককে ফোন করার ঘটনায় তাঁর কোনো ভূমিকা আছে কি না, তা জানতে বিএম আব্দুল্লাহ আল মাসুমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।
ফোনে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ মূল অনুসন্ধানের প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি করে না। ভাটারায় স্ত্রীর নামে থাকা সম্পত্তি, ভূমি রেকর্ডের অসঙ্গতি, ডিপ্লোমেটিক বন্ড ওয়্যারহাউস এবং ফাইল আটকে রাখার অভিযোগের বিষয়ে এখনো স্বাধীন তদন্তের দাবি রয়েছে। দুর্নীতির ডায়েরির নির্বাহী সম্পাদক এ আর জসিম জানিয়েছেন, চাপ বা ভয়ভীতির কারণে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ বন্ধ হবে না এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

