বিআরটিএর উপ-পরিচালক সুব্রত দেবনাথের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টারঃ
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩, উত্তরা দিয়াবাড়ীতে কর্মরত উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) প্রকৌশলী সুব্রত কুমার দেবনাথের বিরুদ্ধে চাকরির শুরু থেকে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে তদন্তের আবেদন জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর অটোরিকশা চালক শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. মোশারফ হোসেন। অভিযোগপত্রে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি বিআরটিএ কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল অঙ্কের অর্থের অনিয়মের দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই সুব্রত দেবনাথ বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে সিএনজি অটোরিকশার প্রতিস্থাপন, নতুন নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো কোনো সরকারি তদন্তে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের অন্যতম বড় অংশ চট্টগ্রাম বিআরটিএতে দায়িত্ব পালনকালীন সময়কে ঘিরে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম মেট্রো বিআরটিএতে সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০০৩ ও ২০০৪ মডেলের প্রায় ২ হাজার ৫০০ সিএনজি অটোরিকশা স্ক্র্যাপ করে প্রতিস্থাপনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি গাড়ির ক্ষেত্রে ৩ লাখ টাকা করে অবৈধ অর্থ আদায়ের মাধ্যমে মোট প্রায় ৭৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। এ কাজে নির্দিষ্ট কয়েকটি শোরুমের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগও করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম পর্বের পর ঢাকা মেট্রো সার্কেল-২-এ দায়িত্ব পালনকালেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, ওই কার্যালয় থেকে প্রায় ২ হাজার সিএনজি অটোরিকশার প্রতিস্থাপন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে গাড়িপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে মোট প্রায় ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ঢাকা জেলা সার্কেলের দায়িত্ব পালনকালে আরও প্রায় ৫০০ সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে গাড়িপ্রতি ১ লাখ টাকা করে প্রায় ৫ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সার্কেলে ফিটনেস, মালিকানা পরিবর্তন, নিবন্ধনসহ নিয়মিত সেবা কার্যক্রমেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আবেদনকারী ও সেবাগ্রহীতাদের তথ্য যাচাই করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
২০২২ সালে সহকারী পরিচালক থেকে উপপরিচালক পদে পদোন্নতির পর সুব্রত দেবনাথ বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আন্তঃজেলা বাস-মিনিবাসের রুট পারমিট সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকার সময় প্রায় ৪০০টি স্লিপার বাসের রুট পারমিট দেওয়া হয় এবং প্রতিটি গাড়ির ক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা করে মোট প্রায় ২০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে অভিযোগপত্রে নির্দিষ্ট নথি বা লেনদেনের প্রমাণ সংযুক্ত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
সুব্রত দেবনাথের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বদলি ঠেকানো এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন জায়গায় পদায়ন পাওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ ভারতে পাচার করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে তার নামে ও বেনামে বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস ও বৈধতা যাচাইয়ের জন্য তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
বর্তমানে সুব্রত কুমার দেবনাথ বিআরটিএ ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩-এর উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি নথিভুক্ত একটি সেবা-সংক্রান্ত তথ্যে তাকে বিআরটিএর উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ২০২৬ সালের জুনে ঢাকা মেট্রো সার্কেল-৩-এর একটি অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতির তথ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
সুব্রত দেবনাথের বিরুদ্ধে এর আগেও দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামে সিএনজি প্রতিস্থাপনকে কেন্দ্র করে বিপুল অর্থের অনিয়মের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এসব প্রতিবেদনের মধ্যেও অভিযোগগুলোর স্বাধীন সরকারি তদন্তে চূড়ান্ত সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারী মো. মোশারফ হোসেন দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে অভিযোগগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন। অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট নথি, সিএনজি প্রতিস্থাপনের তথ্য, রুট পারমিটের রেকর্ড, সম্পদ বিবরণী এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।

