জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ১৮৮২ কোটি টাকার স্যানিটেশন প্রকল্পে লুটপাটের হিড়িক:
চুরি সিন্ডিকেটের মুলহোতা প্রকল্প পরিচালক তবিবুর পুনরায় বহাল তবিয়তে
স্টাফ রিপোর্টার:
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) ১ হাজার ৮৮২ কোটি টাকার গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি, নির্মাণকাজের মান, দরপত্রের শর্ত অনুসরণ এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে নানা অসঙ্গতি নিয়ে সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে একাধিক দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে প্রকল্প পরিচালক মো. তবিবুর রহমান তালুকদারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পটির পাঁচ বছর মেয়াদ শেষের দিকে এলেও কাজের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪৭ শতাংশ। জানুয়ারি ২০২১ থেকে এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত প্রকল্পের অবকাঠামোগত অগ্রগতিও ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। প্রকল্পে আট বিভাগের ৩০ জেলার ১৮ উপজেলায় পানির বড় স্কিম, ছোট স্কিম এবং বিপুলসংখ্যক টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
আইএমইডির প্রতিবেদনে মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের বিভিন্ন কাজের মান নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। পরিদর্শন করা ৪৭টি পানির ছোট স্কিমের বড় একটি অংশ নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি। কোথাও ল্যান্ডিং স্টেশন ভেঙে যাওয়া, কোথাও কলাম বাঁকা হয়ে যাওয়ার মতো ত্রুটিও পাওয়া যায়। কয়েকটি এলাকায় পানির ছোট স্কিমের কাজ বন্ধ থাকার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
পাবলিক টয়লেটের ব্যবহার নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। পরিদর্শন করা ৪৭টি পাবলিক টয়লেটের মধ্যে ৩৮টি, অর্থাৎ প্রায় ৮০ দশমিক ৮৫ শতাংশ, ব্যবহার করা হচ্ছিল না। কোনো কোনো টয়লেট বছরে মাত্র দুই থেকে তিন দিন ব্যবহৃত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। একইভাবে ৩৬টি হাত ধোয়ার স্টেশনের মধ্যে ৭০ শতাংশের বিভিন্ন অংশ নষ্ট, ভাঙা অথবা পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে।
কমিউনিটি ক্লিনিকের টয়লেটগুলোর অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। পরিদর্শন করা ১৯টি টয়লেটের মধ্যে ১৭টি ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় পাওয়া যায়। পাশাপাশি ১২২টি ল্যাট্রিনের শতভাগই নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী স্থাপন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ত্রুটির কারণে পরিবেশগত ক্ষতির পাশাপাশি প্রকল্পের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পের কয়েকটি বড় পানির স্কিম জলাশয়, পুকুর ও ডোবা ভরাট করে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণের ঘাটতি, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণ না করা, যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ এবং নিয়মিত পিআইসি ও পিএসসি সভা না হওয়ার মতো দুর্বলতাও চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রকল্পের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নিম্নমানের কাজ পুনর্র্নিমাণের সুপারিশ করেছে আইএমইডি। যেসব কাজ পুনর্র্নিমাণ সম্ভব নয়, সেসব ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক ক্ষতি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে আদায়ের কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়ম ঠেকাতে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের পরিবীক্ষণ ও উচ্চপর্যায়ের কমিটির মাধ্যমে কাজের মান যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়েছে।
এদিকে তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের বিল ও ঠিকাদারদের অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিল। পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়ার মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেনের স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
তবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। সিরাজগঞ্জে বহুতল বাড়ি, ঢাকার ধানমন্ডিতে বাণিজ্যিক সম্পত্তি ও ফ্ল্যাট এবং বিদেশে সম্পদ থাকার দাবি করে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। এসব সম্পদের উৎস ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ থাকার কথাও জানা গেছে। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস এবং অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের মধ্যেই তবিবুর রহমানকে নতুন করে প্রায় ১ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকার আরেকটি স্যানিটেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে তার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী প্রকল্পের অভিযোগ ও পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে তবিবুর রহমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোন মন্তব্য না সংবাদ কর্মীদের অশোভনীয় আচরন করে তার দপ্তর থেকে সটকে পড়েন।

