Tuesday, 29 September 2026JK LIVE
বিজ্ঞাপন

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে আজাদ-নুরু সিন্ডিকেটের দুর্নীতির পাহাড়

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে আজাদ-নুরু সিন্ডিকেটের দুর্নীতির পাহাড়

স্টাফ রিপোর্টার:

দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হলো সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, যা সংক্ষেপে সওজ নামে পরিচিত। এই সংস্থাকে ঘিরে বর্তমানে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে একটি প্রভাবশালী চক্র, যা আজাদ-নুরু সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম আজাদ রহমান এবং তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইঞ্জিনিয়ার নুরু ইসলামের নেতৃত্বে দপ্তরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ও দুর্নীতিপরায়ণ নেটওয়ার্ক। অভ্যন্তরীণ মহলের দাবি অনুযায়ী, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বদলি বাণিজ্য, বিভিন্ন প্রকল্পের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশ সফরের আড়ালে চালিয়ে যাচ্ছে কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন।

এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট স্তরে পরিচালিত হয়ে থাকে। প্রথম স্তরে রয়েছে লাভজনক বদলি বাণিজ্য, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় পদগুলোতে কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়ার নামে হাতিয়ে নেওয়া হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। দ্বিতীয় স্তরে কাজ করে প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেট, যার মাধ্যমে নিজেদের পছন্দের ঠিকাদার নির্বাচন এবং টেন্ডার অনুমোদনে বিভিন্ন কারসাজি করা হয়। সর্বশেষ ও তৃতীয় স্তরে রয়েছে অর্থপাচার বা অবৈধ লেনদেনের সিন্ডিকেট। পুরো নেটওয়ার্কের মূল সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন এ.কে.এম আজাদ রহমান, আর তার নির্দেশনায় বিভিন্ন ফাইলপত্র অনুমোদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাঠে সক্রিয় থাকেন ইঞ্জিনিয়ার নুরু ইসলাম।

বিতর্কিত অতীত ও রাজনৈতিক সংযোগের বিষয়টি এই চক্রের কার্যক্রমকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। বিগত ২০০৭ ও ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সময় গঠিত ট্র‌্যুথ কমিশনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল এ.কে.এম আজাদ রহমানকে। তা সত্ত্বেও পরবর্তীতে তিনি অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রশাসনে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল হন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সাথে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক সংস্কারের জোয়ার চললেও সওজের অন্দরে এই সিন্ডিকেটের প্রভাব এতটুকুও কমেনি, বরং সওজের এক বদলি প্রজ্ঞাপনে এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে আজাদ রহমানকে ঢাকা জোনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করায় নতুন করে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

দপ্তরের ভেতরে ক্ষমতার অপব্যবহারের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো বিদেশ সফর। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিগত আগস্ট মাসের পরিবর্তনের পর থেকেই অন্তত ৩০ জন কর্মকর্তাকে বিদেশ সফরের অদ্ভুত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব অফিশিয়াল সফরের আসল উদ্দেশ্য থাকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাই কিংবা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ পাচার করা। এই বিদেশ ভ্রমণ ও বিলাসবহুল যাপনের খরচের কোনো সঠিক ব্যাখ্যা সওজ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো পাওয়া যায়নি। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানের নেতৃত্ব নিয়েও দপ্তরের ভেতরে নানা সমালোচনা চলছে, কারণ তিনি পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়ে আসার কারণে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হচ্ছে না বলে অনেকে মনে করেন।

সিন্ডিকেটের এসব দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দিন দিন চরম জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঠিকাদার সংকট দেখিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ দীর্ঘসূত্রিতায় ফেলা হচ্ছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক ও সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথচ সময়মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ করা হয় না। এতে সাধারণ মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং দিনশেষে পুরো সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দেশের প্রশাসনিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সওজের মতো এত বড় ও সংবেদনশীল দপ্তরে যদি দ্রুত কঠোর স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা না যায়, তবে দেশের মূল অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারের সার্বিক সংস্কার কার্যক্রম কেবল কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

এসব বিষয়ে জানতে ইঞ্জিনিয়ার এ.কে.এম আজাদ রহমানকে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেনি।

 

Share this news as a Photo Card

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

Facebook WhatsApp X Telegram
27 September 2026

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে আজাদ-নুরু সিন্ডিকেটের দুর্নীতির পাহাড়

বিস্তারিত কমেন্টস লিংক দেখুন