বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপোর ম্যানেজার মোশারফ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অর্থ লোপাটের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) অধীনে পরিচালিত ঢাকা ট্রাক ডিপো বর্তমানে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পণ্য সাশ্রয়ী মূল্যে ও নিরাপদে পরিবহনের পাশাপাশি দেশের দূরবর্তী অঞ্চলে খাদ্য ও সার পৌঁছানো, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগকালীন জরুরি সাহায্য সরবরাহ এবং হরতাল কিংবা পরিবহন ধর্মঘটের সময়ে রাষ্ট্রীয় সেবা সচল রাখার গুরুদায়িত্ব বহন করে এই প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, খুচরা যন্ত্রাংশ কেনাকাটা এবং পরিবহন সংক্রান্ত নানা চুক্তি সম্পাদনের দায়িত্বও এই ডিপোর ওপর ন্যস্ত। বর্তমানে ২৫৮টি ট্রাক ও ৩৬৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে পরিচালিত এই ডিপোর সার্বিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে নীতিহীন ব্যবস্থাপনার কারণে।
প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অপারেশন ম্যানেজার মো: মোশারফ হোসেন ছিদ্দিকী ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা ট্রাক ডিপোতে যোগদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ডিপোর দৈনন্দিন পরিচালন কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটতে শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, পদায়ন পাওয়ার পর থেকেই তিনি ডিপোর প্রধান খাতগুলোতে জালিয়াতির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এবং মোটা অংকের ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে তিনি এই লোভনীয় পদে আসন পোক্ত করেন। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি সেবামূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্যুত হয়ে পরিচালকদের ব্যক্তিগত অর্থ উপার্জনের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
ডিপোর অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা ও খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রাহের ক্ষেত্রে জালিয়াতির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটছে। ট্রাক মেরামতের নামে অত্যন্ত নিম্নমানের ও পুরনো যন্ত্রাংশ বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি চড়া দামে কেনাকাটা হিসেবে নথিপত্রে দেখানো হয়। এর পাশাপাশি জ্বালানি তেল ব্যবহার, সড়ক ও ফেরি টোলের নামে নিয়মিত ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। এই ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে চালক ও ডিপো প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অলিখিত সমঝোতা গড়ে উঠেছে, যার মাধ্যমে প্রতি মাসেই লাখ লাখ টাকা তছরুপ হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের হরিলুট ডিপোটির অন্যতম প্রধান অনিয়ম। কোনো ট্রাক চালক একটি নির্দিষ্ট ট্রিপে বাস্তবে ১০০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করলে বিল জমার সময় নথিপত্রে তা ১৫০ লিটার হিসেবে দেখানো হয়। এই অতিরিক্ত ৫০ লিটারের বিল ভাউচার অনুমোদন করতে গিয়ে ডিপো ম্যানেজারসহ সংশ্লিষ্ট স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট হারে কমিশন লাভ করেন। এভাবে কেবল জ্বালানি খাত থেকেই বছরে কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য সম্পন্ন হয়। ভুয়া বিলের ওপর কমিশন পাওয়ার কারণে তদারকি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
সড়ক দুর্ঘটনা ও যানবাহন মেরামতের ক্ষেত্রটিকে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো ট্রাক সামান্য দুর্ঘটনার শিকার হলেও দুর্ঘটনার তীব্রতা ও দুর্ঘটনাস্থলের দূরত্ব অনুসারে লম্বা মেরামতের বিল বাউচার তৈরি করা হয়। দেখা যায়, একটি গাড়ি মেরামতে যত টাকা বরাদ্দ বা খরচ দেখানো হয়, তার একটি বড় অংশই চলে যায় আমলা ও প্রশাসনিক চক্রের পকেটে। সরকারি নথিপত্রে মেরামতের কাজ সম্পূর্ণ দেখানো হলেও বাস্তবে ট্রাকগুলো অচল বা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাতেই থেকে যায়।
পূর্বে প্রকাশিত এক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চার বছরে ঢাকা ট্রাক ডিপোর যানবাহন মেরামত ও যন্ত্রাংশ ক্রয়ে মোট ব্যয় হয়েছে ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১ হাজার ৮১১ টাকা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই বিশাল ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ টাকাই অত্যন্ত সূক্ষ্ম কৌশলে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। ডিপোর চালক, প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং ম্যানেজারের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যাদের মধ্যে দুর্নীতির এই অর্থ বণ্টন করা হয়ে থাকে।
যানবাহন চালনা ও কেনাকাটার পাশাপাশি কর্মচারীদের বদলি ও পোস্টিং নিয়ে ডিপো ম্যানেজার মোশারফ হোসেনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নিজস্ব সিন্ডিকেটের সুবিধা অনুযায়ী অধীনস্থ কর্মীদের সুবিধাজনক রুট ও আকর্ষণীয় কাজের দায়িত্ব বরাদ্দ দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে। যারা উৎকোচ প্রদানে ব্যর্থ হন, তাদের দুর্গম বা লাভজনক নয় এমন রুটে পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে এবং সৎ কর্মচারীদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রভাব বজায় রাখতে শীর্ষ পর্যায়ের পদগুলোতেও পছন্দের ব্যক্তিদের বসানোর পাঁচতারা কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে। করপোরেশনের শীর্ষ পদের সংযোগ ব্যবহার করে ডিপোর ক্ষমতাশালী ও নীতি নির্ধারণী পদে নিজস্ব অনুগত কর্মকর্তাদের পদায়ন নিশ্চিত করা হয়। এর ফলে ডিপোর ভেতরে দুর্নীতিবিরোধী কোনো তদন্ত বা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা গড়ে ওঠার সুযোগ থাকে না। রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার পকেট ভরানোর মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

