প্রধানমন্ত্রীর গুলশানের বাসভবন রক্ষণাবেক্ষণে গোপালগঞ্জের বিতর্কিত প্রকৌশলী নিমিতোষ ওঝার পদায়ন ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন
স্টাফ রিপোর্টার:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিভিল শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী নিমিতোষ ওঝার ঢাকা গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ উপবিভাগ-২ এর শাখা-১ এ পদায়নের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পেশাগত, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই নির্দিষ্ট উপবিভাগটির ওপর সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গুলশানের বাসভবনের সার্বিক অবকাঠামো, ভবন সংস্কার ও কারিগরি সেবা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে। ফলে একজন উপসহকারী প্রকৌশলীর সাধারণ বদলি বা প্রশাসনিক দপ্তর পরিবর্তনের বিষয়টি কেবল স্বাভাবিক কর্মস্থলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এই কর্মকর্তার ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পরিচয়, পরবর্তীতে দলীয় সংগঠনে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এবং দায়িত্ব বণ্টনের সামগ্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, নিমিতোষ ওঝা গোপালগঞ্জে তাঁর নিজ জেলায় অধ্যয়নকালে সরাসরি ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজে পড়াশোনা করার সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করার পরও বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করছে। এর পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তাঁর ব্যক্তিগত আইডিতে প্রকাশিত বেশ কিছু পোস্টে সরাসরি আওয়ামী লীগপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান এবং তৎকালীন দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচির প্রতি জোরালো সমর্থনের প্রতিফলন দেখা যেত বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য নির্দিষ্ট আচরণবিধি ও শৃঙ্খলা সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী পদে বহাল থাকা অবস্থায় সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলীয় ভাবাদর্শ প্রচার করতে পারেন না কিংবা প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না। যদি এমনটি ঘটে থাকে, তবে তা প্রশাসনিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। তবে এই ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা আবশ্যক। শুধুমাত্র আংশিক স্ক্রিনশট, অসম্পূর্ণ উদ্ধৃতি, গোপালগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়া কিংবা নির্দিষ্ট কোনো বঙ্গবন্ধুর নাম যুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার ওপর নির্ভর করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা বা রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। অভিযোগের বস্তুনিষ্ঠ সত্যতা নিরূপণের জন্য মূল পোস্টের নির্ভরযোগ্য তথ্য, অ্যাকাউন্টের শতভাগ মালিকানা ও প্রাসঙ্গিক চাকরির নথি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।
নিমিতোষ ওঝার পেশাগত কর্মজীবনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাঁর চাকরিজীবনের একটি বড় ও উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের অধীনে। সাধারণত সরকারি পদে দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা নিজে থেকেই কোনো অনিয়ম বা প্রশাসনিক ত্রুটির প্রমাণ বহন করে না। তবে প্রধানমন্ত্রীর গুলশানের বাসভবনের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ইউনিটে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সেই কর্মকর্তার পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা, কারিগরি সক্ষমতা এবং নতুন পদের দায়িত্বের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পরিষ্কার প্রশাসনিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে।
এই পদায়নের প্রশাসনিক সময়ক্রম বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য ও তারিখ সামনে উঠে আসে। প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের নিরাপত্তা-৩ শাখা থেকে গুলশানের নর্থ অ্যাভিনিউয়ের ১৯৬ নম্বর বাসভবনকে বিশেষ শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা বা কেপিআই হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। এই ঘোষণার ঠিক কিছুদিন পর, অর্থাৎ ৩০ জুলাই গণপূর্ত অধিদপ্তরের মোট ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে একযোগে লটারিভিত্তিক বদলির প্রশাসনিক আওতায় নিয়ে আসা হয়। সেই লটারির ধারাবাহিকতায় গত ২ আগস্ট নিমিতোষ ওঝাকে ফরিদপুর থেকে সরাসরি ঢাকায় এনে এই সংবেদনশীল ইউনিটে পদায়নের দাপ্তরিক আদেশ জারি করা হয়। হিসাব অনুযায়ী, ওই এলাকা কেপিআই হিসেবে ঘোষিত হওয়ার ঠিক ১৭ দিন পর এই পদায়নের আদেশটি প্রকাশিত হয়।
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, লটারিভিত্তিক এই সামগ্রিক বদলি প্রক্রিয়ায় কিছু নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন এবং ঢাকার বিশেষ কিছু সংবেদনশীল ইউনিটে পদায়নের জন্য আগে থেকেই আগাম বাছাইয়ের অঘোষিত বন্দোবস্ত ছিল। যদিও এই ধরনের গুরুতর অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক লিখিত আপত্তি বা তদন্তের ফলাফল ছাড়া চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায় যে, কেপিআই হিসেবে ঘোষিত কোনো স্পর্শকাতর স্থানে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য বিশেষ গোয়েন্দা নিরাপত্তা ছাড়পত্র বা ব্যাকগ্রাউন্ড চেক সংক্রান্ত সঠিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না।
সম্প্রতি তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রবেশমুখে ককটেল নিক্ষেপের ঘটনা এবং গুলশানের কেপিআই সীমানা এলাকায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিবর্গের বিচরণের মতো কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ও আইনশৃঙ্খলাজনিত ঘটনার সঙ্গে প্রকৌশলী নিমিতোষ ওঝার সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ বা তথ্য পাওয়া যায়নি, তবুও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় প্রকৌশলী পদায়নের ক্ষেত্রে সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কঠোর প্রটোকল অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকৌশলী নিমিতোষ ওঝা তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা ছাত্রলীগের পদে থাকার সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, বর্তমান পদায়নটি শতভাগ নিয়মতান্ত্রিক লটারির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এর পেছনে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত আবেদন বা রাজনৈতিক তদবিরের প্রভাব ছিল না। অপরপক্ষে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীও বিষয়টিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পরিশেষে, নিমিতোষ ওঝার পদায়ন ঘিরে উদ্ভূত এই বিতর্কের সঠিক নিরসন হওয়া প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও নথিনির্ভর তথ্যানুসন্ধানের মাধ্যমে। কোনো অসত্য অনুমান বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত হবে না। তিনি সরকারি চাকরিতে বহাল অবস্থায় বিধি লঙ্ঘন করেছেন কি না, পদায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সকল প্রশাসনিক প্রটোকল মানা হয়েছে কি না এবং প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। জনস্বার্থে ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নিরাপত্তার খাতিরে মূল দাপ্তরিক আদেশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যাই এই বিতর্কের একমাত্র নির্ভরযোগ্য সমাধান প্রদান করতে পারে।

