পাবনা-১ আসনে নৌকার প্রার্থী রাজউকের তৃতীয় শ্রেনীর কর্মচারী মোশারফের জালিয়াতির সাম্রাজ্য
স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দেশের নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের শীর্ষ সরকারি সংস্থা হলেও এর একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নজিরবিহীন দুর্নীতি, জালিয়াতি এবং অপশাসনের কারণে সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসন বা ভবনের নকশা অনুমোদনের স্বপ্ন নিয়ে সাধারণ মানুষ যখন এই প্রতিষ্ঠানে আসেন, তখন তাদের মুখোমুখি হতে হয় ঘুষ ও দুর্নীতির এক অদৃশ্য দেওয়ালের। সংস্থাটির তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কিছু কর্মচারী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফাইল গায়েব, নকশা পাসে ঘুষ গ্রহণ এবং অঢেল অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনিক তদারকি ও নজরদারির অভাবেই এই দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দাপটের সঙ্গে অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, এই অনিয়ম ও দুর্নীতির অন্যতম মূল চরিত্র হিসেবে সামনে এসেছে রাজউকের অফিস সহকারী মোশারফ হোসেন স্কাইয়ের নাম। তার আসল নাম মাহবুবুল হক স্কাই। ১৯৮৫ সালে পাবনার সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সময় তিন বছরের জন্য বহিষ্কৃত হওয়ার পর সেই পরিচয় গোপন করতে তিনি নাম পরিবর্তন করে মোশারফ হোসেন স্কাই পরিচয়ে জালিয়াতির পথ বেছে নেন। জালিয়াতির এই ধারাবাহিকতায় তিনি ২০০০ সালে ভুয়া সনদের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে চাকরি নেন এবং পরবর্তীতে সনদ জালিয়াতি প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুত হন। এরপর ২০০১ সালের জুলাই মাসে একই জালিয়াতির তথ্য গোপন করে তিনি রাজউকের অফিস সহকারী পদে যোগদান করেন।
চাকরি পাওয়ার পর থেকেই দ্রুত ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করে মোশারফ হোসেন স্কাইয়ের অবৈধ সম্পদের পাহাড়। প্রথমে মিরপুরের কল্যাণপুর এলাকায় একটি ফ্ল্যাটের মালিক হলেও পরবর্তীতে তা বিক্রি করে তিনি ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক হন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন। শুধু দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি; সরকারি চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও তিনি দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি সম্পৃক্ত হন এবং ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-১ আসন থেকে দলীয় নৌকা প্রতীকের মনোনয়নপত্র পর্যন্ত ক্রয় করেন। অথচ রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান অনুযায়ী, কোনো কর্মচারীর দৃশ্যমান আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ বা দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ জমা না পড়া পর্যন্ত প্রশাসনিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না, যা এই অপরাধ চক্রকে আরও বেশি বেপরোয়া করে তুলেছে।
রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবা সংস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে এবং জনদুর্ভোগ কমাতে বহুমুখী প্রশাসনিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। এর অংশ হিসেবে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, জাতীয় পরিচয়পত্র ও চাকরি শুরুর পূর্বের ইতিহাস ডিজিটাল ডেটাবেজের মাধ্যমে কঠোরভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি কর্মচারীর বার্ষিক সম্পদের হিসাব বাধ্যতামূলকভাবে জমা দেওয়া এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ অডিট পরিচালনা করা উচিত। একই জোনে দীর্ঘমেয়াদী পদায়ন রোধ, প্লটের ফাইল ও নকশা অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় আইনি বিচার সম্পন্ন করার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট কাটানো সম্ভব।

