Thursday, 24 September 2026JK LIVE
বিজ্ঞাপন

কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে ঘুষ বাণিজ্যের রমরমা সাম্রাজ্য, মাসে লেনদেন কোটি টাকার বেশি

কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে ঘুষ বাণিজ্যের রমরমা সাম্রাজ্য, মাসে লেনদেন কোটি টাকার বেশি

স্টাফ রিপোর্টার:

কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ঘুষ সিন্ডিকেট। বনজ সম্পদ রক্ষায় সরকারি কঠোর নির্দেশনা থাকলেও এই স্টেশনে চলছে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের মহোৎসব। বৈধ বা অবৈধ—সব ধরনের কাঠবোঝাই যানবাহন থেকেই এখানে নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের উৎকোচ। ফলে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে বনজ সম্পদ, অন্যদিকে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে পুরো বন বিভাগের ভাবমূর্তি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চেক স্টেশনে কাঠবোঝাই ট্রাক বা ফার্নিচারবাহী কোনো গাড়ি পৌঁছালেই তা থামানোর সংকেত দেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর শুরু হয় তল্লাশির নামে নানা টালবাহানা ও হয়রানি। নিয়ম অনুযায়ী গাড়ি আনলোড করে কাঠের প্রজাতি, পরিমাণ ও বৈধতা যাচাই করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হয় না। ট্রানজিট পাস থাকলেও প্রতিটি গাড়ি থেকে জোরপূর্বক চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। আর কাগজপত্র না থাকলে এই অঙ্ক পৌঁছে যায় লাখ টাকার ঘরে।

সম্প্রতি এই অনিয়মের একটি চাঞ্চল্যকর অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে সোয়াগাজী চেক স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসানকে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে ট্রানজিট পাস ও মামলার ভয় দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করতে শোনা যায়। লাখ টাকা উৎকোচের এই কথোপকথন প্রকাশ্যে আসার পর জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তা এখনো বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ মহিলেও এই নিয়ে অসন্তোষ দানা বাঁধলেও দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় ও ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, সোয়াগাজী চেক স্টেশন থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় পঞ্চাশটি গাড়ি যাতায়াত করে। প্রতিটি গাড়ি থেকে গড়ে দুই লাখ টাকার মতো অবৈধ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এই হিসেবে শুধু এই একটিমাত্র চেকপোস্ট থেকেই প্রতি মাসে লেনদেন হয় কোটি টাকার বেশি। অথচ আইন অনুযায়ী অবৈধ কাঠ পরিবহনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেলে গাড়ি জব্দ, আটক এবং বন আইনে মামলা করার কঠোর বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ না ঘটিয়ে ঘুষের বিনিময়ে এসব অবৈধ পরিবহনকে অবাধে চলাচলের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।

মাঠপর্যায়ের এই দুর্নীতি ও অনিয়মের পেছনে প্রভাবশালী মহলের মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বন বিভাগের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, বারবার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠা সত্ত্বেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা কার্যত দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। এমনকি এ বিষয়ে অভিযুক্ত ডেপুটি রেঞ্জার মো. নাজমুল হাসান এবং কুমিল্লা সামাজিক বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন বা লিখিত বার্তার কোনো সদুত্তর দেননি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে যখন সরকার বৃক্ষরোপণ এবং বনাঞ্চল সুরক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তখন বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ এই দুর্নীতি পুরো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করছে। চেকপোস্টগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে বনজ সম্পদ রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রতিটি স্টেশনে ডিজিটাল লগ সংরক্ষণ, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং কঠোর অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পোস্টিং বাণিজ্য বন্ধ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই গুরুতর অনিয়মের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

Share this news as a Photo Card

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

Facebook WhatsApp X Telegram
23 September 2026

কুমিল্লার সোয়াগাজী ফরেস্ট চেক স্টেশনে ঘুষ বাণিজ্যের রমরমা সাম্রাজ্য, মাসে লেনদেন কোটি টাকার বেশি

বিস্তারিত কমেন্টস লিংক দেখুন