আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়েও বহাল তবিয়তে পাবনা বিআরটিএ কর্মকর্তা আলতাব হোসেন
স্টাফ রিপোর্টারঃ
দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলা, সম্পত্তি ক্রোকের আদেশ এবং আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা—কোনো কিছুই যেন ছুঁতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সহকারী পরিচালক মো. আলতাব হোসেনকে। গুরুতর সব দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়েও তিনি দিব্যি নিয়মিত অফিস করছেন। আদালতের পরোয়ানা জারির পরও একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন প্রকাশ্যে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক প্রশ্ন ও বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, প্রায় চার বছর আগে আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধানের সূত্রপাত হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর দুদক তার ও তার স্ত্রী জিয়াসমীন আরার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে। মামলার এজাহারে আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়। তদন্ত শেষ হওয়ার পর আদালতে অভিযোগপত্রও দাখিল করা হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই দম্পতির সম্পদের ওপরও কঠোর নজরদারি শুরু হয়েছে। আদালতের বিশেষ নির্দেশে জিয়াসমীন আরার নামে থাকা ১৭টি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগ রয়েছে, এই দম্পতির প্রকৃত মালিকানাধীন অনেক সম্পত্তি নিজেদের সন্তানদের নামে কিনে রাখা হয়েছে, যার কিছু অংশ আদালতের ক্রোক আদেশের বাইরে থেকে গেছে।
মামলায় উল্লেখিত সম্পদের বাইরেও আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে পাহাড়সম অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় তার নামে-বেনামে একাধিক প্লট ও বাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরেও রয়েছে বিশাল ভূসম্পত্তি। শুধু দেশেই নয়, বিদেশে অর্থ পাচার এবং বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর না হওয়া নিয়ে। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত আলতাব হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। নিয়ম অনুযায়ী সেই পরোয়ানার অনুলিপি তার বর্তমান কর্মস্থল পাবনার পুলিশ সুপারের কার্যালয় এবং গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে গত ১৪ মে পাবনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ওই পরোয়ানা পৌঁছে গেছে।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পরোয়ানা পৌঁছানোর পরও আলতাব হোসেনের পাবনা দপ্তরে নিয়মিত উপস্থিতি প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। আদালতের পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও কেন তাকে গ্রেফতার করা হলো না এবং পুলিশ বা প্রশাসন কেন নীরব ভূমিকা পালন করছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, আইনের চোখ কি তবে সাধারণ আর বিশেষ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা?
এই পুরো পরিস্থিতিতে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের ভূমিকাও চরম রহস্যজনক। একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা, অভিযোগপত্র এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরও দপ্তরের প্রধান কেন চুপ থাকবেন—তা বোধগম্য নয়। গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং কোনো মন্তব্যও দেননি। দায়িত্বশীল মহলের এই অপারগতা বা উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে আলতাব হোসেন পাবনা বিআরটিএ অফিসকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
আইনের শাসন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ঘটনা একটি বড় ধাক্কা। আদালতের নির্দেশকে উপেক্ষা করে অভিযুক্ত কোনো সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে পদে বহাল থাকেন এবং অফিস করেন, তা এখন একটি লাখ টাকার প্রশ্ন। দুর্নীতি দমন কমিশন ও আদালতের আইনি পদক্ষেপ একদিকে চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিআরটিএ প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অনিয়মের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কী ধরনের দৃশ্যমান প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

