বিআরটিএ রাজশাহী কার্যালয়ে এডি শাহজাহানের দালাল সিন্ডিকেট ও ঘুষ বানিজ্যে সেবাগ্রহীতাদের চরম হয়রানি
স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রাজশাহী সার্কেল কার্যালয় অনিয়ম ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালক শাহজাহানের ছত্রছায়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারী, আনসার সদস্য ও বহিরাগত দালালদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, রিনিউ, শ্রেনী উন্নয়ন, স্মার্টকার্ডের বায়োমেট্রিক গ্রহণ, যানবাহনের ফিটনেস সনদ এবং ডিজিটাল নম্বর প্লেট অনুমোদনসহ প্রতিটি সেবামূলক ধাপে সেবাগ্রহীতারা এই চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
কার্যালয়টিতে সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি বিধিবিধান মেনে পরীক্ষা দিয়ে নির্ভুল উত্তর দেওয়া কিংবা সঠিকভাবে গাড়ি চালানো সত্ত্বেও অগ্রিম ঘুষ না দিলে পরীক্ষার্থীদের অকৃতকার্য করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো সাধারণ প্রার্থীরাও এই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কোনো রকম দুর্নীতির আশ্রয় না নিয়ে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা দিতে গিয়ে বারবার অকৃতকার্য হতে হচ্ছে মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা প্রার্থীদের। পক্ষান্তরে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করলে লিখিত পরীক্ষার উত্তর বলে দেওয়া, বায়োমেট্রিক ও ভাইবা বোর্ডে বিশেষ ছাড় দেওয়া এবং ড্রাগ টেস্ট ছাড়াই লাইসেন্স পৌঁছে দেওয়ার মতো জালিয়াতি অহরহ ঘটছে।
বিআরটিএ রাজশাহী অফিসের প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং অবৈধ লেনদেনের মূল চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করছেন নিচু পদের কিছু কর্মচারী ও আনসার সদস্য। অফিস সহায়কের দায়িত্ব পালনকারী আলী এবং আনসার সদস্য নাজমুল, লিটু, নম্বরধারী সোহেলদের মতো কর্মচারীদের প্রভাব অত্যন্ত প্রকট। গ্রেপ্তার বা আইনি ঝুঁকি এড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীরা সরাসরি নগদ টাকা স্পর্শ করেন না। নিচের স্তরের কর্মচারীদের মাধ্যমে তোলা ঘুষের তহবিল পরবর্তীতে প্রশাসনিক টেবিল অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে ভাগ-বাটোয়ারা হয়।
কার্যালয়টিতে বিভিন্ন সেবার বিপরীতে অবৈধ লেনদেনের একটি সুনির্দিষ্ট দরদাম বা রেটকার্ড গড়ে উঠেছে। গাড়ি ও মোটরসাইকেলের যৌথ লাইসেন্স পেতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, প্রিলিমিনারি ও ভাইবা পরীক্ষায় পাশ নিশ্চিত করতে তিন হাজার টাকা এবং সরাসরি লাইসেন্স হস্তান্তরে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া লাইসেন্স নবায়ন ও শ্রেনী উন্নয়নে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা এবং যানবাহনভেদে ফিটনেস ও বায়োমেট্রিক বিচ্যুতি কাটিয়ে উঠতে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষের লেনদেন চলছে।
দুর্নীতির এই ভয়াবহ চিত্র জাতীয় পর্যায়ের জরিপেও প্রতিফলিত হয়েছে। সেবা খাতে দুর্নীতির তথ্য বিষয়ক জাতীয় খানা জরিপ অনুসারে, বিআরটিএ থেকে সেবা নিতে গিয়ে দেশের ৭৯.৩ শতাংশ খানা অনিয়মের সম্মুখীন হয় এবং ৬৩.৫ শতাংশ খানা সরাসরি ঘুষ দিতে বাধ্য হয়। রাজশাহী সার্কেলের এই পরিস্থিতি জাতীয় চিত্রকেই পুনর্ব্যক্ত করে, যেখানে চালক ও সেবাগ্রহীতারা প্রতি নিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনিয়ম রোধে ব্যর্থ হয়ে অনেক প্রশিক্ষক ও ড্রাইভিং স্কুলের প্রতিনিধিরাও প্রার্থীদের ঘুষ দিয়ে কাজ শেষ করার পরামর্শ দিতে বাধ্য হন।
অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিএ রাজশাহী সার্কেলের সহকারী পরিচালক সকল দায় অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, বর্তমানের অধিকাংশ সেবা ডিজিটালাইজড হওয়ায় এবং অনলাইনে লাইসেন্স রিনিউ হওয়ায় অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন। পরীক্ষায় পক্ষপাতিত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, খাতায় পাশ থাকলে কাউকে ফেল করানোর সুযোগ নেই, তবে ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু বিচ্যুতি বা শিথিলতা থাকতে পারে। এছাড়া কর্মচারীদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর পরও বিআরটিএ রাজশাহী সার্কেলের প্রশাসনিক শিথিলতা ও তদারকির অভাবে দালাল সিন্ডিকেটের আধিপত্য কমেনি। ভুক্তভোগীদের মতে, সরকারি সেবার এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে দালালচক্র উচ্ছেদসহ সংশ্লিষ্ট অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক।

