কিশোর গ্যাং সভ্য সমাজের জন্য অশনি সংকেত।
শাহীন মির্জা:
সমুদ্রের ঢেউ আর কালবৈশাখী ঝড়ের মতো কিশোরের যৌবণকাল যা দেখে তাই রঙ্গিণ মনে হয়- নিজেকে ক্ষমতাধর বাদশা ভাবে যত অপকর্মই করুক তার পিছে তারা একটা যুক্তি দাড় করায় ও দাম্ভিকতা দেখায় আমরা ওদেও অপরাধ দেখি কিন্তু সংশোধনের কোন পথ দেখাই না কেনো? হাজার প্রশ্ন উত্তর দিবে কে? একটি কিশোরের হাতে থাকার কথা বই, খাতা কিংবা খেলাধুলার সরঞ্জাম। তার চোখে থাকার কথা ভবিষ্যতের স্বপ্ন। অথচ সেই কিশোরের হাতেই যখন উঠে আসে ছুরি, চাপাতি কিংবা অন্য কোনো অস্ত্র; যখন বন্ধুত্বের জায়গা দখল করে নেয় সংঘবদ্ধ অপরাধ, তখন সেটি শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়—পুরো সমাজের জন্যই অশনি সংকেত। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোরদের সংঘবদ্ধ হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয়ভাবে এসব দলকে বলা হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’। কিশোর বয়স মানুষের জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়। এই বয়সেই ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়। কিন্তু পারিবারিক অবহেলা, সামাজিক অস্থিরতা, মাদক, বেকারত্ব, প্রযুক্তির অপব্যবহার, অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের সংস্পর্শ এবং রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ের মতো নানা কারণে কিছু কিশোর ধীরে ধীরে অপরাধী চক্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। শুরুতে বিষয়টি হয়তো নিছক আড্ডা, আধিপত্য বিস্তার কিংবা দলবদ্ধ ঘোরাফেরা। পরে সেটিই রূপ নেয় মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, অস্ত্র বহন এমনকি হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া একটি বড় কারণ। বাবা-মা দুজনই কর্মজীবী হলে অনেক সময় সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয় না। আবার অনেক পরিবারে সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় নজরদারি থাকে না। ফলে কিশোররা নিজেদের মতো করে বন্ধু নির্বাচন করে এবং অনেক সময় ভুল মানুষের প্রভাবে পড়ে যায়। পারিবারিক অশান্তি, দারিদ্র্য, বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক অবহেলাও কিশোরদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। যে কিশোর পরিবারে ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও স্বীকৃতি পায় না, সে বাইরে কোনো একটি গোষ্ঠীর মধ্যে নিজের পরিচয় খুঁজতে পারে। গ্যাং তাকে ‘ক্ষমতা’, ‘বন্ধুত্ব’ এবং ‘গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার’ অনুভূতি দেয়। এভাবেই একটি নিরীহ বন্ধুত্ব ধীরে ধীরে অপরাধী গোষ্ঠীর আনুগত্যে পরিণত হতে পারে। মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাদকের সহজলভ্যতা একজন কিশোরকে যেমন অপরাধে জড়াতে পারে, তেমনি অপরাধী গোষ্ঠীও মাদককে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও অর্থের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মাদক কেনার অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে কিশোররা ছিনতাই, চুরি বা চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। আবার কেউ কেউ মাদক বহন বা বিক্রির কাজে ব্যবহৃত হয়। অপরাধী চক্রগুলো অনেক সময় কিশোরদেরই ব্যবহার করে, কারণ তাদের বয়স কম হওয়ায় আইনগত পরিস্থিতি সম্পর্কে তারা পুরোপুরি সচেতন নয় এবং অপরাধীরা তাদের সহজে প্রভাবিত করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সহিংস কনটেন্ট, অপরাধকে রোমাঞ্চকর হিসেবে উপস্থাপন করা ভিডিও এবং ভার্চুয়াল জগতে অপরাধী মানসিকতার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কিশোরদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমান সময়ের কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তিদেও আশ্রয় প্রশ্রয় ও নিজ বাহিনীকে শক্তিশালী করার জন্য কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তারের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রশ্রয়ের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে আসে। কোনো অপরাধী গোষ্ঠী যদি মনে করে তাদের পেছনে শক্তিশালী কেউ আছে, তাহলে তাদের অপরাধ করার সাহস বেড়ে যায়। একটি সমাজে আইনের শাসন দুর্বল হলে অপরাধীরা কিশোরদের ব্যবহার করার সুযোগ পায়। তাই শুধু কিশোরদের গ্রেপ্তার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যারা কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিশোরদের চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান জায়গা। শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, নৈতিকতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও নাগরিক মূল্যবোধ শেখানোর ক্ষেত্রেও বিদ্যালয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত হচ্ছে, আচরণে বড় পরিবর্তন এসেছে, নতুন ও সন্দেহজনক বন্ধুদের সঙ্গে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে কিংবা অস্বাভাবিক অর্থ ব্যয় করছে—এসব বিষয় শিক্ষকদের নজরে আসা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও অনেক সময় শিক্ষকরাও ছাত্র নামের কিশোর গ্যাংয়ের কাছে অসহায়। কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, কী ধরনের অনলাইন কনটেন্ট দেখে—এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন থাকা প্রয়োজন। কিশোর অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু প্রতিটি কিশোরকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না। অনেক কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে পরিস্থিতির শিকার হয়ে। তাদের সংশোধন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দিতে হবে। একজন কিশোর যদি অপরাধের পথ থেকে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, সেটিই সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন। কারাগার বা শাস্তির পাশাপাশি পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিশোর গ্যাং কোনো একটি পরিবার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার সমস্যা নয়। এটি পুরো সমাজের সমস্যা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যম—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। আজকের কিশোররাই আগামী দিনের নাগরিক, নেতৃত্ব এবং সমাজের চালিকাশক্তি। তাদের একটি অংশ যদি অপরাধের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি প্রজন্ম নয়, পুরো রাষ্ট্র। কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই তাই কেবল অপরাধ দমনের লড়াই নয়; এটি একটি প্রজন্মকে রক্ষা করার লড়াই। একটি শিশুকে অপরাধী হওয়ার পর সংশোধন করার চেয়ে অপরাধের পথে যাওয়ার আগেই তাকে সঠিক পথ দেখানো অনেক বেশি কার্যকর। আমাদের মনে রাখতে হবে, হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়া কিশোরটি জন্মগতভাবে অপরাধী নয়। তার ভেতরেও স্বপ্ন আছে, সম্ভাবনা আছে, ভালো কিছু করার শক্তি আছে। প্রয়োজন শুধু সঠিক দিকনির্দেশনা, ভালোবাসা, নিরাপদ পরিবেশ এবং সময়মতো হস্তক্ষেপ। কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার তাই সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে একটি অশনি সংকেত। তবে এই সংকেতকে যদি আমরা সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করি এবং পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র একসঙ্গে কার্যকর উদ্যোগ নিই, তাহলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। রাজনীতির দখল বাজ নেতারা এই কিশোর গ্যাঙ্গেও চাঁদাবাজি ও আধিপত্য দখলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে যা কিশোরদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ক্ষনিকের জন্য কিছু টাকা পেয়ে শিক্ষার আলো থেকে এরা বহুদূরে থাকে। কিশোর অপরাধের মুল শিকড়ে আঘাত হানতে না পারলে শুধু শাস্তিÍ দিয়ে কিশোর অপরাধ নির্মুল করা যাবে না। লোক দেখানো বক্তব্য আর সভাসেমিনার যেনো শুধুই আনুষ্ঠানিকতা না হয়। উদ্দেশ্য সৎ থেকে রাষ্ট্রপ্রশাসন যদি কঠোর ও কার্যকরি উদ্দ্যেগ নিয়ে সমাজবিজ্ঞানিদের পরামর্শ নিয়ে প্রতি এলাকায় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এর কুফল বর্ণনা করে সবাই যদি একত্রে কাজ করে তবে কিশোর কমানো সম্ভব। কিশোর গ্যাং যে হাওে দ্রুত চারদিকে ছাড়িয়ে পড়ছে এটা এখনি কঠোর হাতে দমন করতে হবে এ নিয়ে সুশীল সমাজ পতিরা কি ভাবছেন ভাবনায় অবশ্যই পজেটিভ আসতে হবে নয় তো সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্রর জন্য কিশোর গ্যাং অসনি সংকেত হয়ে থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিষ্ট, নাট্যকার

