Tuesday, 29 September 2026JK LIVE
বিজ্ঞাপন

রাজউকের অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে মিটার জব্দের পর ২০ লাখ টাকায় রহস্যজনক সমঝোতার অভিযোগ

রাজউকের অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে মিটার জব্দের পর ২০ লাখ টাকায় রহস্যজনক সমঝোতার অভিযোগ

আনিসুর রহমান:

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ভবন নির্মাণ তদারকি এবং নকশা বহির্ভূত স্থাপনা অপসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো নিয়ে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন উঠছে। সম্প্রতি পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের মালাকারটোলায় রাজউকের একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং পরবর্তীতে একই ভবনে অবৈধ নির্মাণকাজ চলমান থাকার ঘটনা এই ব্যবস্থাকে নতুন করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছেন রাজউকের জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস হোসেন ও ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলম। যাঁদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

 

ঘটনার সূত্রপাত গত ১০ আগস্ট। রাজউক জোন-৭/১-এর আওতাধীন সূত্রাপুরের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর মালাকারটোলা লেনের একটি নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালায় মোবাইল কোর্ট। অভিযানে ভবনটির নকশাবহির্ভূত বা ব্যত্যয়কৃত অংশের আংশিক অপসারণ করা হয় এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে একটি মিটার জব্দ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কোনো ভবন বা স্থাপনার মিটার জব্দ ও কাজ বন্ধ করে দেওয়ার পর সেখানে আর অবৈধ কার্যক্রম চলার সুযোগ থাকে না। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ ও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিযানের কিছুদিন পরই ওই ভবনটিতে ফের পুরোদমে নির্মাণকাজ শুরু হয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ভবনটির মালিক আমির হোসেন নিজেই দাবি করেছেন যে রাজউককর্তৃক জব্দ করা মিটারটি তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেই মিটার দিয়েই তিনি আবার কাজ চালাচ্ছেন। প্রশ্ন উঠেছে, রাজউকের মতো একটি সরকারি সংস্থার জব্দ করা মিটার কোন আইনি প্রক্রিয়ায় বা কারুকুশিমিতায় আবার ভবন মালিকের হাতে ফিরে গেল? এই ঘটনার পেছনে প্রায় ২০ লাখ টাকার একটি কথিত ‘রফাদফা’ বা গোপন সমঝোতার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় পর্যায়ে। এই আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেন এবং ইমারত পরিদর্শক রাফিউল আলমের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। যদিও পরিদর্শক রাফিউল আলম অনিয়ম পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও মিটার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আদালতের আদেশের কথা বলে দায় এড়াতে চেয়েছেন, যা বিষয়টি আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

শুধু মালাকারটোলার এই ঘটনাই নয়, রাজউক কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হোসেনকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। গত বছরগুলোতেও তাঁর বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। রাজধানীর ফার্মগেট, তেজতুরী বাজার, পূর্ব রাজাবাজার, ধানমন্ডি, কলাবাগান এবং নিউ এলিফ্যান্ট রোডের বেশ কয়েকটি ভবনে অবৈধ নির্মাণ ও নোটিশ দেওয়ার পর দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থের বিনিময়ে অনেক ভবনের নোটিশ গায়েব করে দেওয়া কিংবা মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পরও মোটা অঙ্কের আর্থিক সমঝোতার মাধ্যমে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। ২০২১ সালে একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নকশা অনুমোদন ও বদলির জন্য ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছিল। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ এবং দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে বিভাগীয় মামলার তথ্যও সামনে এসেছে।

রাজউকের এই ধরনের কর্মকাণ্ডে প্রতিবেশী ও সাধারণ মানুষের জীবনও চরম ঝুঁকিতে পড়ছে। মালাকারটোলার ওই ঘটনার ক্ষেত্রে কেবল নকশা বা সাইডব্যাকের ব্যত্যয় ঘটেনি, বরং পাশের একটি আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা সম্পূর্ণ বিঘ্নিত হয়েছে। গত এপ্রিল মাসে স্থানীয় বাসিন্দা দিলীপ কুমার দাস রাজউক কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন যে, অভিযুক্ত ভবনটি নির্মাণের সময় তাঁদের ভবনের সীমানা ঘেঁষে কাজ করা হচ্ছে এবং তাদের বাড়ির কয়েকটি দেওয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। নির্মাণকাজের বিকট শব্দে পরিবারের অসুস্থ সদস্যদের শারীরিক অবস্থারও অবনতি ঘটছে। এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কোনো কার্যকর সুরাহা হয়নি। উল্টো অভিযোগকারীরা বিভিন্নভাবে হুমকির শিকার হচ্ছেন।

রাজধানীর অপরিকল্পিত ও নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণ রোধে রাজউকের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নকশা অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি ও পরিদর্শন কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ইলিয়াস হোসেনকে ঘিরে ওঠা প্রতিটি অভিযোগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারণ রাজউকের কাজ যদি শুধু নোটিশ দেওয়া, লোক দেখানো অভিযান চালানো এবং মিটার জব্দ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, আর পরবর্তীতে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে সেগুলো আবার চালু হয়ে যায়, তবে আইনের শাসন চরমভাবে ব্যাহত হয়।

একটি সরকারি সংস্থায় নিয়োজিত দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যখন বারবার দুর্নীতির ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তখন তা কেবল একটি দপ্তরের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে না, বরং পুরো নগরের কোটি মানুষের নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। মালাকারটোলার ভবন নির্মাণ ও মিটার ফেরত দেওয়ার এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে রাজউকের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে কঠোর মনিটরিং এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করা হলে রাজধানীতে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের রমরমা বাণিজ্য কোনোভাবেই থামানো সম্ভব হবে না।

এব্যাপারে  অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেনের বক্তব্য জানতে তার দপ্তরে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

Share this news as a Photo Card

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

Facebook WhatsApp X Telegram
28 September 2026

রাজউকের অথরাইজড অফিসার ইলিয়াস হোসেনের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্টে মিটার জব্দের পর ২০ লাখ টাকায় রহস্যজনক সমঝোতার অভিযোগ

বিস্তারিত কমেন্টস লিংক দেখুন